২০২৬ সালে ঢাকায় একটি বিয়ের আসল খরচ কত (পূর্ণ হিসাব)
২০২৬ সালে ঢাকায় বিয়ের খরচের ধাপে ধাপে হিসাব — হল, খাবার, স্বর্ণ, কাপড়, ছবি আর যেসব ছোট খরচ পরিবারগুলো সবসময় ভুলে যায়, সঙ্গে তিনটি বাস্তব বাজেট।
দুই পরিবার বিশ মিনিট ধরে তারিখ নিয়ে কথা বলছে — শুক্রবার ভালো হবে না শনিবার, রোজার পরে রাখা যায় কি না। তারপর একজন চাচা কাপটা নামিয়ে রেখে সেই প্রশ্নটাই করেন, যেটা নিয়ে এতক্ষণ সবাই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন। বিয়ের খরচ কত হবে?
ঘরের কারও কাছেই আসল সংখ্যাটা নেই। আছে কিছু টুকরো তথ্য — দুই শীত আগে উত্তরায় এক কাজিনের কত খরচ হয়েছিল, মিরপুরের এক কমিউনিটি সেন্টারের মাথাপিছু রেট কারও কাছে শোনা, আর একটা সাধারণ ধারণা যে সবকিছুর দামই বেড়ে গেছে। তাই ২০২৬ সালে ঢাকায় একটি বিয়ের খরচের ধাপে ধাপে হিসাবটাই এখানে দেওয়া হলো, টাকায় — যেসব খরচ পরিবারগুলো কথা দিয়ে ফেলার পরে টের পায়, সেগুলোসহ।
২০২৬ সালে ঢাকায় বিয়ের খরচ: মোটা দাগে
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগে যে মধ্যবিত্ত বিয়েতে ৮–১০ লাখ টাকা খরচ হতো, এখন সেটিই সাধারণভাবে দাঁড়াচ্ছে ১২–১৫ লাখ টাকায়। এটি কোনো একটি অনুষ্ঠানের খরচ নয়। এটি পুরো ধারাবাহিকতা — আকদ, গায়ে হলুদ, রিসেপশন, কাপড়, স্বর্ণ ও উপহার — যা সাধারণত দুই পরিবারের মধ্যে অসমভাবে ভাগ হয়ে যায়।
এই সংখ্যা দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার আগে বুঝে নিন এটি কী আড়াল করছে। ঢাকার বিয়ে একটি বাজেট নয়, দুটি বাজেট — আর দুটি একে অন্যকে টেনে ওপরে তোলে। নিচের পরিসরগুলো শহরের পরিবারগুলো বাস্তবে যা দিচ্ছে তার প্রতিফলন। এগুলো নির্ধারিত রেট নয়, নিজের পরিকল্পনার শুরুর বিন্দু — হল, মৌসুম আর দরকষাকষির ওপর এগুলো বদলায়।
- সাদাসিধে, একটিমাত্র অনুষ্ঠান: মোটামুটি ২.৫–৪ লাখ টাকা।
- সাধারণ মধ্যবিত্ত, দুই-তিনটি অনুষ্ঠান: মোটামুটি ৬–৯ লাখ টাকা।
- পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী, কনভেনশন হল ও ভারী স্বর্ণ: ১২–১৫ লাখ টাকা বা তার বেশি।
হল আর খাবার: যে খরচ বাকি সব ঠিক করে দেয়
ঢাকার বিয়েতে প্রায় প্রতিটি খরচই একটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে — আপনি কতজনকে খাওয়াবেন। টিবিএস জানিয়েছে, ক্লাবের ক্যাটারিং মাথাপিছু প্রায় ৮০০ টাকা, আর বুফে ধরনের ভেন্যুতে ১,০০০–১,৫০০ টাকা। মোহাম্মদপুর, মিরপুর বা যাত্রাবাড়ীর কমিউনিটি সেন্টার এর নিচে, পাঁচতারা হোটেল অনেক ওপরে।
একটি কার্ড ছাপানোর আগেই হিসাবটা কষে ফেলুন, কারণ অতিথি তালিকাই আসল বাজেট:
- ২০০ জন × ৮০০ টাকা — শুধু খাবারেই ১,৬০,০০০ টাকা।
- ৪০০ জন × ১,২০০ টাকা — ৪,৮০,০০০ টাকা; তালিকা দ্বিগুণ মনে হলেও খরচ তিন গুণেরও বেশি।
- ৬০০ জন × ১,৫০০ টাকা — ৯,০০,০০০ টাকা, আর এর মধ্যে হল ভাড়া, সাজসজ্জা বা স্টেজ ধরা নেই।
বেশিরভাগ ভেন্যুতে হল ভাড়া আলাদা, আর ঢাকায় তা সাধারণ কমিউনিটি সেন্টারের ক্ষেত্রে প্রায় ৪০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ভরা মৌসুমের শুক্রবারে কনভেনশন হলের জন্য কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। ফাঁদগুলো রেটে নয়, চুক্তিপত্রে — পার্কিং, সার্ভিস চার্জ, বাইরের ক্যাটারিংয়ের ওপর বাড়তি ফি আর বাতিলের শর্ত। পুরোটা ধরে ধরে বলা আছে ঢাকায় বিয়ের ভেন্যু বাছাই লেখায়।
বাজেট থেকে ২ লাখ টাকা কমাতে হলে একশ অতিথি কমান। তালিকার আর কোনো খরচ কমিয়ে এত সাশ্রয় হবে না।
স্বর্ণ, আর যে খরচ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ২,১৭,৩৮২ টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২১ সালের দাম মাথায় রেখে যে পরিবার গয়নার পরিকল্পনা করেছিল, একই ওজনের জন্য তাদের দায়টি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশেষ করে কনেপক্ষের পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার বিস্তারিত লিখেছে — ধারদেনা, ছবির জন্য ভাড়া করা সেট, আর বিয়ের অনেক পরেও টেনে চলা চুপচাপ ঋণ। বাজেটের রক্তক্ষরণ যদি স্বর্ণেই হয়, তাহলে জুয়েলারির দোকানে যাওয়ার পরে নয়, তার আগেই পড়ুন বাংলাদেশে বিয়ের স্বর্ণ।
কাপড়, পার্লার আর সাজগোজের খরচ
- কনের শাড়ি বা লেহেঙ্গা: সাধারণত ১৫,০০০–৬০,০০০ টাকা, আর গুলশান-বনানীর ডিজাইনার কাজে এর অনেক ওপরে।
- বরের শেরওয়ানি বা পাঞ্জাবি সেট: সাধারণত ৮,০০০–৩৫,০০০ টাকা।
- কনের পার্লার প্যাকেজ (মেকআপ, চুল, শাড়ি পরানো, প্রায়ই বাসায় এসে): প্রতি অনুষ্ঠানে সাধারণত ১২,০০০–৪০,০০০ টাকা। এ কারণেই তিনটি অনুষ্ঠান হলে এই খরচ কারও নজরে না পড়েই তিন গুণ হয়ে যায়।
- পরিবারের কাপড়। এটিই অদৃশ্য খরচ। মা, বোন, খালারা দুই-তিনটি অনুষ্ঠানের জন্য কিনতে গিয়ে কনের নিজের পোশাকের চেয়েও বেশি খরচ করে ফেলেন।
ছবি, সাজসজ্জা আর চোখে পড়া খরচগুলো
ঢাকায় ছবি তোলার খরচ এখন ক্যাটারিংয়ের মতোই স্তরে স্তরে ভাগ। এক প্রান্তে একজন ফটোগ্রাফারের এক দিনের প্যাকেজ, অন্য প্রান্তে পুরো একটি টিম — সিনেমাটিক ভিডিও, সেম-ডে এডিট আর অ্যালবামসহ, যার খরচ কয়েক লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকে। ডিসেম্বর-জানুয়ারির জন্য আগেভাগে বুক করুন, কারণ ভালো টিমগুলো মাস কয়েক আগেই শেষ হয়ে যায়। কী চাইবেন আর চুক্তিতে কী রাখবেন, তা আছে বাংলাদেশে বিয়ের ফটোগ্রাফি লেখায়।
স্টেজ আর ডেকোরেশনের খরচের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। ফুল আর কাপড়ের সাধারণ একটি স্টেজ অল্প খরচেই হয়ে যায়; আবার আমদানি করা ফুল, থিম করা প্রবেশপথ আর ভারী আলোকসজ্জায় দুইশ মানুষকে খাওয়ানোর চেয়েও বেশি খরচ হয়ে যেতে পারে। দুটির কোনটি আপনার কাছে বেশি জরুরি সেটি ঠিক করে নিন — ছবি দুই ক্ষেত্রেই ভালো আসবে।
যেসব ছোট খরচ পরিবারগুলো ভুলে যায়
- কাজীর ফি ও বিয়ে নিবন্ধন। নিবন্ধন ফি সরকারি বিধিতে নির্ধারিত এবং তা সামান্যই, কিন্তু তালিকাটি কেউ জানে না বলে পরিবারগুলোর কাছ থেকে নিয়মিতই বেশি নেওয়া হয়। কাজী বুক করার আগে কাজী আইনত কত টাকা নিতে পারেন — এই আলোচনাটি দশ মিনিট সময় দেওয়ার মতো।
- কার্ড ও ছাপা। খাম আর পৌঁছে দেওয়ার খরচসহ প্রতি কার্ড প্রায়ই ৬০–২০০ টাকা, ফলে ৫০০ কার্ড আলাদা করে হিসাব করার মতো খরচ।
- যাতায়াত। সাজানো গাড়ি, বরযাত্রীর মাইক্রোবাস, পার্কিং আর তিন অনুষ্ঠানজুড়ে তেলের খরচ।
- মিষ্টি ও উপহার বিনিময়। মণ হিসেবে মিষ্টি, তত্ত্বের ডালা, দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের উপহার।
- বকশিশ ও কর্মীদের খরচ। হলের কর্মী, ড্রাইভার, পার্লারের টিম। রাতের বেলা চমকে না গিয়ে আগেই বাজেটে রাখুন।
- অনিশ্চয়তার জন্য বরাদ্দ। দশ শতাংশ যোগ করুন। কিছু না কিছু বাদ পড়বেই, আর বিয়ের সময় ধার করা সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত।
তিনটি বাস্তব বাজেট
- ৩.৫ লাখ টাকা — একটি অনুষ্ঠান, ১৫০ অতিথি। কমিউনিটি সেন্টার ও খাবার ১,৫০,০০০; সাধারণ সাজসজ্জা ২৫,০০০; বর-কনের কাপড় ৪৫,০০০; পার্লার ১৫,০০০; ছবি ৩০,০০০; কার্ড ও ছাপা ১৫,০০০; যাতায়াত ও উপহার ৩০,০০০; নিবন্ধন ও অন্যান্য ১৫,০০০; অনিশ্চয়তা ২৫,০০০। স্বর্ণ আলাদা ও পরিমিত।
- ৮ লাখ টাকা — আকদ ও রিসেপশন, ৩০০ অতিথি। ভেন্যু ও খাবার ৩,৬০,০০০; হল ভাড়া ও সাজসজ্জা ১,২০,০০০; কাপড় ১,০০,০০০; দুই অনুষ্ঠানের পার্লার ৫০,০০০; ছবি ও ভিডিও ১,০০,০০০; কার্ড ৪০,০০০; যাতায়াত, মিষ্টি ও উপহার ৬০,০০০; অনিশ্চয়তা ৭০,০০০। স্বর্ণ এই হিসাবের ভেতরে নয়, বাইরে।
- ১৫ লাখ টাকা — তিনটি অনুষ্ঠান, ৫০০ অতিথি, কনভেনশন হল। শুধু খাবারেই ৬–৭ লাখ, হল ও সাজসজ্জা ৩ লাখ, ছবি ও ভিডিও ২ লাখ, কাপড় ও পার্লার ২ লাখ, বাকিটা কার্ড, যাতায়াত, উপহার ও অনিশ্চয়তায়। বর্তমান দামে স্বর্ণ এর সঙ্গে আরও কয়েক লাখ যোগ করতে পারে।
টাকা আসলে কোথায় নষ্ট হয়
- তালিকা বেড়ে যাওয়া। দুইশ থেকে তিনশ হয়ে যায়, কারণ কাউকে বাদ দেওয়ার কৈফিয়ত কেউ দিতে চায় না। আগে সংখ্যাটা ঠিক করুন, তারপর দুই পক্ষ ভাগ করে নিক।
- ভরা মৌসুমে যাচাই না করে বুকিং। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে হল থেকে ফটোগ্রাফার — সব স্তরেই বাড়তি দাম।
- অন্যের বিয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া। যে পরিবারই বাজেট ছাড়িয়ে যায়, তারা প্রায় সবাই নির্দিষ্ট করে বলতে পারে কোন বিয়েটির সঙ্গে তারা মিলিয়ে চলছিল।
- এক সন্ধ্যার জন্য ধার করা। রিসেপশনের জন্য নেওয়া ঋণ শোধ হয় বিয়ের প্রথম বছরে — যে বছরে একটি দম্পতির পক্ষে এই চাপ নেওয়া সবচেয়ে কঠিন।
- উপহার আর দাবিকে গুলিয়ে ফেলা। বরপক্ষ বিয়ের শর্ত হিসেবে যা চায় তা-ই যৌতুক, আর তা দাবি করা যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রথা যত পুরোনোই হোক, তা একে বৈধ করে না।
তারিখ ঠিক করার আগে অঙ্কটা ঠিক করুন
যেসব পরিবার বিয়ের পর ঋণ ছাড়া বেরিয়ে আসে, তারা সবচেয়ে বেশি টাকাওয়ালা পরিবার নয়। তারা সেইসব পরিবার, যারা একটি সর্বোচ্চ সীমা ঠিক করেছিল, কে কোন খরচ দেবে তা লিখে রেখেছিল আর তুলনা করা বন্ধ করেছিল। এই আলোচনাটি মাস ধরে ধরে সাজানো আছে আমাদের বিয়ের বাজেট পরিকল্পনা লেখায়।
তার আগে অবশ্য ঠিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলাটাও জরুরি। amarjibon-এ প্রতিটি প্রোফাইল এনআইডি ও লাইভনেস সেলফি দিয়ে যাচাই করা, প্রথম আলাপ থেকেই পরিবার যুক্ত থাকতে পারে, আর যেসব বিষয় সত্যিই মিল ঠিক করে সেগুলো ধরেই ফিল্টার করা যায় — ধর্মচর্চা, শিক্ষা, নিজ জেলা, আর কাজ, টাকা ও থাকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রত্যাশা। এটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই, আর আপনি না চাইলে ফোন নম্বর গোপন থাকে। প্রোফাইল খোলা বিনামূল্যে।
আরও পড়ুন
- বাংলাদেশি বিয়ের খরচের হিসাব (২০২৬)
- বাগদান হয়েছে, থাকছেন দূরে: দূরত্বের সম্বন্ধ যেভাবে টিকিয়ে রাখবেন
- গায়ে হলুদ চেকলিস্ট: ঢাকায় যা যা লাগবে
**amarjibon.com-এ বিনামূল্যে প্রোফাইল খুলুন, অথবা অ্যাপটি নামিয়ে নিন Google Play বা App Store থেকে।** বিয়ে, সিরিয়াসভাবে।