বিদেশে বিয়ে: প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিকাহ ও নিবন্ধন
বিদেশের মসজিদে নিকাহ হলেই তা নিবন্ধিত বিয়ে হয়ে যায় না। কাগজপত্র বাস্তবে কীভাবে চলে, আর বেশিরভাগ দম্পতির কেন দুটোই লাগে।
টরন্টোর এক দম্পতির নিকাহ হয়েছিল শুক্রবার সন্ধ্যায়, ষাটজনের মতো মানুষের সামনে। ইমাম পড়িয়েছেন, দুজন সাক্ষী সই করেছেন, মোহর ঠিক হয়ে ঘোষণাও হয়েছে, আর মসজিদ থেকে সোনালি পাড়ের সুন্দর একটি সনদও দেওয়া হয়েছে। এগারো মাস পর মাকে বেড়াতে আনার আবেদন করতে গিয়ে স্ত্রী জানলেন, প্রদেশের খাতায় তাঁর বিয়েটাই হয়নি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কাগজপত্র নিয়ে সবচেয়ে সাধারণ ভুলটি এটিই, আর এতে সময়, টাকা, এমনকি কখনো কখনো ভিসাও যায়। প্রবাসে নিকাহ আর আইনত নিবন্ধিত বিয়ে দুটি আলাদা জিনিস — আর আপনি কোথায় থাকেন ও এরপর কী করতে চান, তার ওপর নির্ভর করে দুটোই লাগতে পারে, সঙ্গে সত্যায়নের একটি পুরো ধাপমালা।
মসজিদের নিকাহ আর আইনি বিয়ে এক ঘটনা নয়
নিকাহ ইসলামি আইনের একটি চুক্তি: ইজাব ও কবুল, দুজন সাক্ষী, নির্ধারিত মোহর, আর দুই পক্ষের স্বাধীন সম্মতি। এই শর্তগুলো পূরণ হলেই তা সম্পন্ন। কিন্তু এটি আপনাআপনি এমন কোনো রেকর্ড তৈরি করে না যা সরকারি দপ্তর স্বীকৃতি দেয়।
নিবন্ধন রাষ্ট্রের আলাদা একটি কাজ। এটিই সেই কাগজ তৈরি করে যা ব্যাংক, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, হাসপাতাল, বিমা প্রতিষ্ঠান ও আদালত বাস্তবে পড়ে। একটি বিয়ে ধর্মীয়ভাবে পুরোপুরি বৈধ হয়েও আইনের চোখে অদৃশ্য থাকতে পারে — টরন্টোর ওই দম্পতি ঠিক সেই অবস্থাতেই পড়েছিলেন। পূর্ণাঙ্গ নিকাহর জন্য শুরুতে কী কী লাগে, তা আছে আমাদের নিকাহ প্রক্রিয়ার গাইডে।
অনুষ্ঠানের আগে একটি প্রশ্ন করুন: এরপর কোন সরকারি দপ্তরে আমাদের বিয়ের রেকর্ড থাকবে, আর কাগজটির নাম কী হবে? কেউ উত্তর দিতে না পারলে বুঝবেন আপনার কেবল নিকাহ হয়েছে, আর কিছু নয়।
বাংলাদেশিরা যেসব দেশে থাকেন, সেখানে নিবন্ধন কীভাবে হয়
নিয়ম দেশভেদে আলাদা এবং বদলায়ও, তাই তারিখ ঠিক করার আগে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বর্তমান শর্ত জেনে নিন।
- যুক্তরাজ্য। ধর্মীয় অনুষ্ঠান কেবল সীমিত পরিস্থিতিতেই আইনত স্বীকৃত বিয়ে তৈরি করে। অনেক দম্পতি আলাদা করে সিভিল অনুষ্ঠান করেন, অথবা নিবন্ধিত ভবনে অনুমোদিত ব্যক্তির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান করেন। ব্রিটিশ বাংলাদেশি দম্পতিদের একটি বড় অংশ নিকাহ ও সিভিল নিবন্ধন আলাদাভাবে করেন।
- যুক্তরাষ্ট্র। বিয়ে অঙ্গরাজ্যের বিষয়। প্রায় সব অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠানের আগে কাউন্টি থেকে ম্যারেজ লাইসেন্স নিতে হয়, আর অনুষ্ঠানের পর সই করা লাইসেন্স জমা দেন অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী। ইমামকে ওই অঙ্গরাজ্যে বিয়ে পড়ানোর অনুমোদিত হতে হয়।
- কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। দুই দেশেই লাইসেন্স বা বিয়ের নোটিশ লাগে, আর প্রদেশ বা রাজ্যে নিবন্ধিত অনুষ্ঠান-পরিচালক লাগে। অনেক ইমামের এই নিবন্ধন আছে, অনেকের নেই। সরাসরি জিজ্ঞেস করুন।
- উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়া। পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন, প্রায়ই শরিয়াহ আদালত বা সরকারি ধর্মবিষয়ক দপ্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর বিদেশি নাগরিকদের জন্য বাড়তি ধাপ থাকে। এসব দেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর নিজস্ব নির্দেশনা আছে, কিছু বুক করার আগে তা পড়ে নেওয়া ভালো।
নিকাহ যদি বাংলাদেশে হয়
এক পক্ষ দেশে এসে বিয়ে করলে নিবন্ধন করেন লাইসেন্সপ্রাপ্ত মুসলিম বিবাহ নিবন্ধক, অর্থাৎ কাজী — মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী। তিনি যে কাবিননামা পূরণ করেন সেটিই আইনি রেকর্ড, আর তাঁর রেজিস্টার থেকে দেওয়া সত্যায়িত অনুলিপিই শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দূতাবাস দেখতে চাইবে।
এক পক্ষ প্রবাসে থাকলে দুটি বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা দরকার। নাম লিখুন হুবহু পাসপোর্টের বানানে — পুরোনো এনআইডি বা স্কুল সার্টিফিকেটের বানানে নয় — কারণ এক অক্ষরের গরমিলও পরে বড় দেরি ঘটায়। আর সত্যায়িত অনুলিপি দেশ ছাড়ার আগেই সংগ্রহ করুন, তিন মাস পরে কাজিনকে পাঠাতে বলবেন না। পুরো ধাপক্রম আছে আমাদের বিবাহ নিবন্ধন গাইডে।
দুজনের একসঙ্গে দেশে থাকা সম্ভব না হলে পরিবারগুলো প্রায়ই কোর্ট ম্যারেজ বা প্রবাস থেকে নিবন্ধনের কথা জিজ্ঞেস করে। প্রবাসীদের কোর্ট ম্যারেজ ও নিবন্ধন নিয়ে এই বাংলা আলোচনায় প্রচলিত পদ্ধতিটি বলা আছে, তবে বিস্তারিত আপনার অবস্থার ওপর নির্ভর করে এবং একজন বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত।
সত্যায়ন: যে ধাপমালা কাবিননামাকে বিদেশে কাজে লাগায়
শুধু কাবিননামার কোনো ওজন বিদেশি মন্ত্রণালয়ে নেই। একে একটি ধাপমালার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, আর প্রতিটি ধাপ আগেরটির ওপর নির্ভরশীল।
- কাজীর রেজিস্টার থেকে সত্যায়িত অনুলিপি, সই ও সিলসহ।
- ইংরেজি অনুবাদ, গন্তব্য দেশ চাইলে। সাধারণত অনানুষ্ঠানিক নয়, নোটারি করা অনুবাদই চাওয়া হয়। ভালো অনুবাদে কী কী থাকে, তা আছে বিয়ের সনদের ইংরেজি অনুবাদ লেখায়।
- নোটারি, আর প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা রেজিস্ট্রার অফিসের যাচাই।
- ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন। এই ধাপটিই মানুষ সবচেয়ে বেশি বাদ দিয়ে ফেলেন। কাবিননামা মন্ত্রণালয় থেকে কীভাবে সত্যায়িত হয় তার সংক্ষিপ্ত বাংলা ব্যাখ্যাটি একটি অপ্রয়োজনীয় দৌড় বাঁচিয়ে দেবে।
- গন্তব্য দেশের দূতাবাসের সত্যায়ন বা স্বীকৃতি, সেই দেশ চাইলে।
দিন নয়, সপ্তাহ ধরে সময় হাতে রাখুন, আর একাধিক সত্যায়িত অনুলিপি রাখুন। দূতাবাস প্রায়ই কাগজ জমা রেখে দেয়, আর দোহা বা ডেট্রয়েটে বসে কাজীর রেজিস্টার থেকে দ্বিতীয় অনুলিপি জোগাড় করা ঢাকায় থাকতে করার চেয়ে অনেক কঠিন।
অন্য পক্ষের দূতাবাস কী চাইবে
আপনার সঙ্গী বাংলাদেশি না হলে, কিংবা বাংলাদেশে বিয়ে করে বিদেশে আবেদন করতে চাইলে, ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিদেশি দূতাবাস সাধারণত নিজেদের শর্তাবলি প্রকাশ করে। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস বিয়ের সনদ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশ করে, আর বেশিরভাগ মিশনই তা করে। ২০১৯ সালে কোনো আত্মীয় যা করেছিলেন তা অনুসরণ না করে নিজের দেশের প্রকৃত নির্দেশনাপত্রটি পড়ুন, কারণ এসব কাগজ হালনাগাদ হয়।
সাধারণত চাওয়া হয় দুই পক্ষের পরিচয়পত্র, সত্যায়িত কাবিননামা, অনুবাদ, অনুষ্ঠানের প্রমাণ, আর কখনো কখনো এই প্রমাণ যে কারও আগে বিয়ে হয়নি বা আগের বিয়ে যথাযথভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
বিয়ের কাগজ আর স্পাউস ভিসা এক সমস্যা নয়
সঠিকভাবে নিবন্ধিত ও সত্যায়িত বিয়ে স্পাউস ভিসার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু কেবল এটুকুই যথেষ্ট নয় — আর এই পার্থক্যটাই অনেক পরিবারকে হতাশ করে।
বেশিরভাগ দেশ আয়, বাসস্থান, সম্পর্কের প্রমাণ আর কখনো ভাষার পরীক্ষাও নেয়। যেমন যুক্তরাজ্যে পার্টনার ভিসার সর্বনিম্ন আয়ের শর্ত ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাড়ানো হয়েছে, আর সীমা, ছাড় ও প্রমাণের নিয়মগুলো দেওয়া আছে হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির পারিবারিক অভিবাসনে আয়ের শর্ত শীর্ষক ব্রিফিংয়ে। এই ক্ষেত্রের নিয়ম নিয়মিতই বদলায়।
তাই ভিসার ফলাফলকে বিয়ের পরিকল্পনার অংশ ধরে নেবেন না। কেউ কথা দেওয়ার আগে নিজের দেশের বর্তমান নিয়ম যাচাই করুন, আর সম্প্রদায়ের পরামর্শে ভরসা না করে নিজের কেস নিয়ে একজন যোগ্য ইমিগ্রেশন পরামর্শক বা আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন। সীমান্তপারের সম্বন্ধ ভাবছেন এমন পরিবারের জন্য বাস্তব দিকগুলো আছে আমাদের প্রবাসী ম্যাট্রিমনি লেখায়।
তারিখ ঠিক করার আগে ছোট একটি তালিকা
- কোন দপ্তরে বিয়ে নিবন্ধিত হবে, আর অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী সেখানে অনুমোদিত কি না — নিশ্চিত হয়ে নিন।
- কিছু সই হওয়ার আগে প্রতিটি বানান পাসপোর্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
- মোহর ও তার উশুল-বাকির ভাগ অনুষ্ঠানের টেবিলে নয়, আগেই ঠিক করুন।
- অন্তত দুই কপি সত্যায়িত অনুলিপি নিন, আর সত্যায়নের কাজ সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করুন।
- ভিসার বর্তমান নিয়ম নিজে, লিখিতভাবে, সরকারি উৎস থেকে যাচাই করুন।
এখানে amarjibon কোথায়
সীমান্তপারের বিয়েতে কাগজপত্র বেশি, ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও বেশি — তাই যাচাইয়ের মূল্য এখানে দেশের চেয়েও বেশি। amarjibon-এ প্রতিটি প্রোফাইল এনআইডি ও লাইভনেস সেলফি দিয়ে যাচাই করা, ফলে এমন কারও সঙ্গে নিকাহর আলোচনা হয় না যাঁর অস্তিত্বই হয়তো নেই। বসবাসের দেশ, নিজ জেলা, ধর্মচর্চার মাত্রা, শিক্ষা ও পেশা ধরে ফিল্টার করা যায়, আর প্রথম আলাপ থেকেই পরিবার যুক্ত থাকতে পারে। প্ল্যাটফর্মটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই, আর আপনি না চাইলে ফোন নম্বর গোপন থাকে।
আরও পড়ুন
- বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন: বাস্তব গাইড
- উশুল ও বাকি দেনমোহর: কোনটা কখন, পরিষ্কার করে
- কাবিননামা: মুসলিম বিবাহচুক্তি — সহজ ব্যাখ্যা
**amarjibon.com-এ বিনামূল্যে প্রোফাইল খুলুন, অথবা অ্যাপটি নামিয়ে নিন Google Play বা App Store থেকে।** বিয়ে, সিরিয়াসভাবে।