ভিসার জন্য বিয়ের সনদ অনুবাদ ও সত্যায়ন করাবেন যেভাবে
বাংলা কাবিননামার ছবি কোনো দূতাবাস নেয় না। ইংরেজি সনদ, নোটারি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন আর দূতাবাসের লিগ্যালাইজেশন — পুরো ধাপগুলো ক্রম অনুযায়ী।
দোহায় বসে একজন রান্নাঘরের টেবিলে রাখা কাবিননামার ছবি তুলে ভিসা পোর্টালে আপলোড করলেন, তারপর এগারো সপ্তাহ অপেক্ষার পর জানলেন কাগজটি গ্রহণযোগ্য নয়। কুমিল্লায় থাকা তাঁর স্ত্রীকে এবার পুরো কাজটি নতুন করে, সঠিক ক্রমে শুরু করতে হলো — আর তিনি ছুটির দিন গুনতে থাকলেন।
এ ধরনের প্রায় প্রতিটি প্রত্যাখ্যানের পেছনে একই ভুল: বাংলা কাবিননামাকে সম্পূর্ণ কাগজ ভেবে নেওয়া। দেশের বাইরে যেকোনো কাজে এটি একটি ধারাবাহিকতার প্রথম ধাপ, শেষ ধাপ নয়। বাংলাদেশে বিয়ের সনদ সত্যায়নের একটি নির্দিষ্ট ক্রম আছে, আর ক্রম ভাঙলে আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হয়।
দূতাবাস আসলে কী চায়
ঢাকার মিশনগুলো সাধারণত একটি নয়, দুটি কাগজ চায়: কাজী অফিস থেকে নেওয়া নিকাহনামা বা কাবিননামা, এবং বিয়ের সনদ — বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই। ঢাকার সুইডিশ দূতাবাস ঠিক এই জোড়াটিই চায়, আর তা-ও যিনি নিবন্ধন করেছেন সেই রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের নির্দেশনাও একই রকম, আর সেখানে বারবার বলার মতো একটি কথা আছে: আবেদনকারী বা তাঁদের আত্মীয়দের করা বিয়ের হলফনামা গ্রহণ করা হয় না। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান বিবাহের ক্ষেত্রে তারা সিটি করপোরেশনের রেজিস্ট্রার অফিসের সনদ, অথবা যে পুরোহিত, গির্জা বা মন্দির বিয়ে সম্পন্ন করেছে তাদের দেওয়া সনদ নেয়।
মিশনভেদে শর্ত আলাদা, আর তা বদলায়ও। নিচের কোনো ধাপে টাকা খরচ করার আগে আপনি যে দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে কাজ করছেন তাদের বর্তমান নির্দেশনা পড়ে নিন।
ধাপগুলো, ক্রম অনুযায়ী
- রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে সত্যায়িত নকল নিন। যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজীর কাছে রেজিস্টার আছে, নকল আসবে তাঁর কাছ থেকেই। বিয়ে নিবন্ধিতই না হয়ে থাকলে তার আগে আর কিছুই সম্ভব নয়। দেখুন বাংলাদেশে বিবাহ নিবন্ধন।
- ইংরেজি বিয়ের সনদ নিন। বেশিরভাগ রেজিস্ট্রার বাংলা কাবিননামার পাশাপাশি ইংরেজি ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটও দেন। তিন বছর পরে নয়, একই দিনেই চেয়ে নিন।
- অনুবাদ নোটারি করান — যেখানে ইংরেজি সনদ পাওয়া যাচ্ছে না এবং অনুবাদ ব্যবহার করতে হচ্ছে। নোটারি পাবলিক বা হলফনামা কমিশনার অনুবাদকের ঘোষণাটি সত্যায়িত করেন।
- স্থানীয় যাচাই। কাগজ ও জেলাভেদে মন্ত্রণালয় গ্রহণ করার আগে রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করাতে হতে পারে।
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন। মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার শাখা কাগজটিকে বিদেশে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে প্রত্যয়ন করে। এই ধাপটিকেই সবাই সবচেয়ে হালকাভাবে নেয়।
- দূতাবাসের লিগ্যালাইজেশন। অনেক দেশ, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো, মন্ত্রণালয়ের সত্যায়নের পর ঢাকায় তাদের নিজেদের মিশন থেকেও কাগজটি লিগ্যালাইজ করাতে বলে। কেউ কেউ বলে না। লাইনে দাঁড়ানোর আগে জেনে নিন।
ইংরেজি সংস্করণটি নির্ভুল করা
কোনো সিলের চেয়ে ইংরেজি লেখার ভুলেই বেশি ফাইল আটকায়, আর কারণগুলো একেবারেই সাধারণ।
- নাম পাসপোর্টের সঙ্গে হুবহু মিলতে হবে — মধ্যনাম, মো. বা মোহাম্মদ, আর বছরখানেক আগে পাসপোর্ট অফিস যে বানান বেছে নিয়েছিল, সবসহ। যে অনুবাদক আপনার বানান শুধরে দেন, তিনি আপনার ফাইলটাই নষ্ট করেন।
- তারিখগুলো সংগতিপূর্ণ হতে হবে। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার তারিখ আর নিবন্ধনের তারিখ ফরমের আলাদা দুটি ঘর, আর সেগুলো নিজ নিজ জায়গাতেই থাকা চাই।
- সংখ্যা সাবধানে রূপান্তর করতে হবে, বিশেষ করে দেনমোহরের অঙ্ক, যা কথায় ও অঙ্কে দুইভাবেই থাকে।
- কিছুই বাদ দেওয়া যাবে না। দূতাবাস যে ঘরটি দেখতে চেয়েছিল সেটি চুপচাপ বাদ দেওয়া অনুবাদের চেয়ে অনুবাদ না থাকাই ভালো।
কারও হাতে দেওয়ার আগে কোন ঘরে কী আছে দেখে নিতে চাইলে আমাদের কাবিননামার ঘর ধরে ধরে গাইডে পঁচিশটি ঘরই ব্যাখ্যা করা আছে।
মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন বাস্তবে যেভাবে হয়
সত্যায়নের কাজটি করে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও কল্যাণ শাখা, আর আবেদন, সরকারি ফি জমা ও কাগজ সংগ্রহের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা, ফি ও সময় বদলায়, তাই ২০২১ সালে কোনো কাজিন কী করেছিলেন তার ওপর ভরসা না করে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব মাধ্যম থেকে বর্তমান নিয়ম জেনে নিন। কাউন্টারে আসলে কী চাওয়া হয়, তা দেখানো আছে কাবিননামা সত্যায়নের এই ধাপে ধাপে আলোচনায়।
দুটি অভ্যাস অনেক ভোগান্তি বাঁচায়। এক, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সত্যায়িত নকল তুলে রাখুন, কারণ প্রতিটি গন্তব্য দেশ সাধারণত একটি কপি রেখে দেয়। দুই, প্রতিটি ধাপে সব কাগজ ও রসিদ স্ক্যান করে এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কারও অনুমতি ছাড়া পৌঁছাতে পারেন।
দেশভেদে যে পার্থক্যগুলো জানা দরকার
এখানে একক কোনো আন্তর্জাতিক মান নেই, আর দেশে দেশে পার্থক্যটাও ছোট নয়।
- উপসাগরীয় দেশ। নিয়োগকর্তা, ফ্যামিলি ভিসা অফিস ও রেসিডেন্স বিভাগ সাধারণত ঢাকায় মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন এবং তারপর সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের লিগ্যালাইজেশন চায়, কখনো কখনো পৌঁছানোর পর আবারও সত্যায়ন লাগে।
- যুক্তরাজ্য। বিয়ের সনদ ফ্যামিলি ভিসা আবেদনের একটি অংশ মাত্র, যেখানে স্পন্সরের আয়ও বড় বিষয়। সীমা ও ছাড়ের বিষয়গুলো আছে হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির পারিবারিক অভিবাসনে আয়ের শর্ত ব্রিফিংয়ে।
- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। সাধারণত দক্ষ অনুবাদকের সার্টিফায়েড অনুবাদ লাগে, অনুবাদকের প্রত্যয়নপত্রসহ — আর কোন ব্যবস্থায় ঠিক কী ভাষায় তা চায়, সেটি আলাদা।
আমরা অভিবাসন পরামর্শ দিই না, আর কারও আপনাকে ফলাফলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত নয়। সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি নির্দেশনা পড়ুন, আর বিষয়টি জটিল হলে একজন যোগ্য অভিবাসন আইনজীবীর এক ঘণ্টার পরামর্শ কিনে নিন। প্রত্যাখ্যাত আবেদনের চেয়ে সেটি অনেক সস্তা।
যে কারণে ফাইল ফেরত আসে
- সত্যায়িত নকল চাওয়া হয়েছিল, দেওয়া হয়েছে ছবি বা ফটোকপি।
- এনআইডি, পাসপোর্ট ও কাবিননামায় নামের বানান তিন রকম।
- বিয়ে অনিবন্ধিত, কিংবা নিবন্ধনের বদলে হলফনামা দেওয়া হয়েছে।
- ভুল ক্রমে সত্যায়ন, ফলে মন্ত্রণালয়ের সিল এমন কাগজে বসেছে যা দূতাবাস স্বীকৃতি দেবে না।
- গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক সময়ে ইস্যু করা কপি চায়, অথচ দেওয়া হয়েছে অনেক পুরোনো সনদ।
বিয়ে যদি দেশের বাইরে হয়ে থাকে
বিদেশে সম্পন্ন নিকাহর পথ আলাদা। সাধারণত যে দেশে বিয়ে হয়েছে সেখানকার আইনে নিবন্ধন করাতে হয়, আর নাগরিকদের জন্য নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট সেবা দেয় বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো। দুটিই করা জরুরি: এক দেশে স্বীকৃত অথচ আরেক দেশে অদৃশ্য বিয়ে পরে সন্তান, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ে সমস্যা তৈরি করে। ধাপগুলো আছে প্রবাসে বাংলাদেশিদের নিকাহ লেখায়।
শুরু হোক এমন কারও সঙ্গে, যিনি কাগজপত্র নিয়ে সিরিয়াস
সত্যায়ন লম্বা পথের শেষ ধাপ, আর যাঁরা এই পথটা শান্তভাবে পার হন তাঁরা শুরুতেই অভিবাসন স্ট্যাটাস, আয়, কাগজপত্র ও সময়সীমা নিয়ে সৎ ছিলেন। এসব আলোচনা তারিখ ঠিক হওয়ার পরে নয়, খোঁজ শুরুর সময়ই হওয়া উচিত। আপনার খোঁজ সীমান্ত পেরোলে বাস্তব পরিকল্পনার দিকগুলো আছে প্রবাসী ম্যাট্রিমনি লেখায়।
amarjibon-এ প্রতিটি প্রোফাইল এনআইডি ও লাইভনেস সেলফি দিয়ে যাচাই করা, প্রথম বার্তা থেকেই পরিবার যুক্ত থাকতে পারে, আর আপনি সেসব বিষয়েই ফিল্টার করতে পারেন যা সীমান্তপারের সম্বন্ধে সত্যিই কাজে লাগে — নিজ জেলা, ধর্মচর্চা, শিক্ষা, আর কে এখন কোথায় আছেন। এটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই, আর আপনি না চাইলে ফোন নম্বর গোপন থাকে।
আরও পড়ুন
- বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ে: আইনত যে অনুমতি লাগবেই
- বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী দেখা: ইসলামের নিয়ম
- দেনমোহর কখনো পরিশোধ না হলে কী হয়? আইনি পথগুলো
**amarjibon.com-এ বিনামূল্যে প্রোফাইল খুলুন, অথবা অ্যাপটি নামিয়ে নিন Google Play বা App Store থেকে।** বিয়ে, সিরিয়াসভাবে।