দেনমোহর কখনো পরিশোধ না হলে কী হয়? আইনি পথগুলো
দেনমোহর ঋণ, উপহার নয়। পরিশোধ না হলে আইন কী বলে, মামলায় কোন প্রমাণ কাজে লাগে, আর আদালতে যাওয়ার আগে কী কী করা যায়।
ফেনীর এক নারীর সংসার ছিল উনিশ বছরের। বিয়ে ভাঙার পর কাবিননামায় লেখা চার লাখ টাকার বাকি মোহরের কথা তুলতেই তাঁকে, তাঁর নিজের ভাইদের সামনেই, বলা হলো — ওটা তো বিয়ের খরচের সঙ্গেই অনেক আগে মিটে গেছে। কোনো পরিশোধের হদিস কেউ দেখাতে পারল না। ঘরের সবার ভাব দেখে মনে হলো, প্রশ্নটা তোলাই যেন রুচিহীন।
বাংলাদেশে অপরিশোধিত মোহরের দাবি সাধারণত এই চেহারাতেই আসে। নাটকীয় অস্বীকার খুব কমই হয়। হয় ধীরে ধীরে ধরে নেওয়া যে টাকাটা প্রতীকী ছিল, আর কেউ শেষমেশ জিজ্ঞেস করলে অস্বস্তি। আইন বিষয়টিকে অনেক সরলভাবে দেখে। দেনমোহর পরিশোধ না হলে সেটি অপরিশোধিত ঋণ, আর তা আদায়ের পথ আছে। এই লেখায় সেই পথটি সহজ করে বলছি, সঙ্গে এটাও বলছি কেন আদালতই আপনার প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত নয়।
দেনমোহর ঋণ, উপহার নয়
মোহর বিবাহচুক্তি থেকেই তৈরি হওয়া একটি দায়। এটি স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সংসারের সম্পত্তি হয়ে যায় না, আর সময় পেরিয়ে গেলে বা বিয়ের খরচ বেশি হয়েছিল বলে বাতিলও হয় না।
এ থেকে দুটি কথা আসে। সংসার চলাকালীন অপরিশোধিত অংশটি স্বামীর কাছে স্ত্রীর পাওনা ঋণ হিসেবেই থাকে। আর স্বামীর মৃত্যুর পর তা ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের আগেই তাঁর সম্পত্তি থেকে পরিশোধযোগ্য — এ কারণেই বিধবাদের প্রায়ই চুপচাপ বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে প্রসঙ্গটি না তোলাই ভালো। উশুল ও বাকির কাঠামো বোঝা প্রথম ধাপ, তা আছে উশুল ও বাকি দেনমোহর লেখায়।
কখন থেকে আইনত দাবি করা যায়
উশুল অংশ নিকাহর পর যেকোনো সময় দাবি করা যায়। বাকি অংশ দাবি করা যায় দুই পক্ষের ঠিক করা তারিখে, বিয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়, অথবা মৃত্যুর পর সম্পত্তি থেকে।
কাবিননামায় পরিশোধের পদ্ধতি নিয়ে কিছু লেখা না থাকার খুব প্রচলিত অবস্থার জন্য একটি কাজের বিধান আছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ১০ ধারা বলছে, পরিশোধের ধরন সম্পর্কে কিছু উল্লেখ না থাকলে পুরো মোহরই চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ কাগজের নীরবতা স্বামীর পক্ষে যায় না।
বিয়ে যখন শেষ হচ্ছে, মোহরের প্রশ্নটি তালাক, খুলা বা আদালতের ডিক্রির সঙ্গেই আসে, আর তিনটির প্রক্রিয়া আলাদা। সেগুলো দেওয়া আছে খুলা ও তালাকের পার্থক্য লেখায়।
মামলা কোথায় হয়
মোহর, ভরণপোষণ ও সংশ্লিষ্ট পারিবারিক বিষয়গুলো দেখে পারিবারিক আদালত, আর এমন মামলা বিরল নয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালে ঢাকায় ১৩,২৮৮টি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে, যার বড় অংশ করেছেন নারীরা — আর এসব নথির অনেকগুলোতেই মোহর একটি জীবন্ত প্রশ্ন। এখতিয়ারভুক্ত আদালতে মামলা দায়ের হয়, বিবাদীকে নোটিশ যায়, আর বিচার শুরুর আগে আদালত সাধারণত আপস-মীমাংসার চেষ্টা করে।
দুটি বাস্তবতা সৎভাবে বলা দরকার। বাংলাদেশে পারিবারিক মামলা দীর্ঘ সময় নিতে পারে, আর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে — প্রক্রিয়ার কিছু অংশ অনলাইনে নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রথম আলো পারিবারিক আদালতের মামলা অনলাইনে হওয়ার খবর দিয়েছে। প্রথম আলোয় সহজ বাংলায় ডিভোর্সের যে আইনগুলো মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝে তার একটি সারসংক্ষেপও আছে, কারও সঙ্গে কথা বলার আগে সেটি পড়ে নেওয়া ভালো। আপনার জেলায় এখন কী প্রযোজ্য, তা আপনার আইনজীবীই ভালো জানবেন।
মামলার ফল ঠিক করে যা: প্রমাণ
মোহরের মামলা যুক্তির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে কাগজের ওপর। আগে নিচের জিনিসগুলো জোগাড় করুন।
- কাবিননামা, বিশেষ করে ড্রয়ারে পড়ে থাকা কপি নয়, কাজীর নিজের রেজিস্টার থেকে দেওয়া সত্যায়িত অনুলিপি। সবকিছুর শুরু মোহরের ঘরগুলোতে যা লেখা আছে তা থেকে। কোন ঘরে কী বোঝায়, তা আছে আমাদের ঘর ধরে ধরে কাবিননামা লেখায়।
- পরিশোধ বা অপরিশোধের যেকোনো রেকর্ড। ব্যাংক লেনদেন, গয়নার রসিদ, লিখিত স্বীকৃতি, বা যেসব বার্তায় অঙ্কটি নিয়ে কথা হয়েছে।
- বিয়ের ও পরিশোধের সাক্ষী। রেজিস্টারে নাম থাকা সাক্ষীরা, কাজী, আর যেসব পরিবারের সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
- বিয়ে কীভাবে শেষ হয়েছে তার প্রমাণ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে: নোটিশ প্রক্রিয়ার পর দেওয়া তালাকের সনদ, বা মৃত্যুসনদ।
সবচেয়ে ক্ষতিকর কাগজটি হলো এমন কাবিননামা, যেখানে পরিশোধ না হয়েও মোহর সম্পূর্ণ পরিশোধিত লেখা আছে। আদালত শুরু করে কাগজ থেকেই। এতে দাবি অসম্ভব হয়ে যায় না, কিন্তু প্রমাণের ভারী বোঝা স্ত্রীর ওপর এসে পড়ে — আর ঠিক এ কারণেই এটিকে কখনো নিছক আনুষ্ঠানিকতা ভেবে সই করা উচিত নয়।
সময়সীমা, আর দেরি করলে যে ক্ষতি
বাংলাদেশের আইনে টাকার দাবির ক্ষেত্রে তামাদির সময়সীমা আছে, মোহরের দাবিও এর বাইরে নয়। সাধারণত যে সময়সীমাগুলো আলোচিত হয়, তা গোনা শুরু হয় দাবি জানিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার দিন থেকে, অথবা বিয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দিন থেকে — অংশটি উশুল না বাকি, তার ওপর নির্ভর করে।
আপনার ক্ষেত্রে ঠিক কোন সময়সীমা প্রযোজ্য, আর কিছু তা থামিয়ে দিয়েছে কি না — সেটি ব্লগের নয়, আইনজীবীর প্রশ্ন। নিরাপদে যা বলা যায় তা হলো, দেরিতে দাবির প্রতিটি অংশ কঠিন হয়ে যায়: সাক্ষীরা দূরে চলে যান বা মারা যান, কাজীর রেজিস্টার পুরোনো ও দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ে, আর সেদিন কী হাতবদল হয়েছিল সে নিয়ে স্মৃতি আলাদা হয়ে যায়। দাবি করার ইচ্ছা থাকলে পরিবার নিজে থেকে মিটিয়ে দেবে এই আশায় আরও পাঁচ বছর না কাটিয়ে আগেই পরামর্শ নিন।
মামলার আগে যা করে দেখবেন
দুই পরিবারের মধ্যে মামলা দীর্ঘ, ব্যয়বহুল, আর এতে কেউই সম্মানিত বোধ করে না। অনেক ক্ষেত্রেই মামলা ছাড়াই দাবি মেটে, আর নিচের পথগুলো আগে চেষ্টা করার মতো।
- লিখিত দাবি। শান্ত ভাষায়, তারিখসহ একটি চিঠি — কত টাকা বাকি আর পরিশোধের অনুরোধ। খরচ নেই, প্রায়ই সাড়া মেলে, আর দাবি জানানোর একটি রেকর্ডও তৈরি হয়।
- দুই পক্ষের একজন করে সম্মানিত মুরুব্বি নিয়ে মধ্যস্থতা। আটজন আত্মীয় নয়। এক পক্ষে একজন।
- ঋণের লিখিত স্বীকৃতি ও কিস্তির সময়সূচি। অনেক স্বামীই একসঙ্গে দিতে পারেন না, কিন্তু দুই বছরে পারেন — আর বেশিরভাগ স্ত্রীই রায়ের চেয়ে টাকাটাই চান।
- একজন সম্মানিত স্থানীয় আলেমের পরামর্শ, বিশেষ করে অন্য পক্ষ যদি দায়টিকে ধর্মীয়ভাবে ঐচ্ছিক মনে করে। সেটি ঐচ্ছিক নয়। মোহর আটকে রাখার পরিণতি নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা আছে স্ত্রী মোহর না পেলে কী হয় শীর্ষক এই বাংলা ব্যাখ্যায়।
এর কোনোটিতেই কাজ না হলে একজন পারিবারিক আইনজীবী দ্রুতই বলে দেবেন আপনার প্রমাণ দাবিটিকে সমর্থন করে কি না। প্রথম বৈঠকেই খরচ ও সম্ভাব্য সময় জিজ্ঞেস করুন, আর বিশেষভাবে জিজ্ঞেস করুন জিতলে ডিক্রি জারির পর্যায়ে কী হয় — কারণ ডিক্রি আর হাতে টাকা এক জিনিস নয়।
প্রথম দিন থেকেই দাবিটি সুরক্ষিত রাখার উপায়
এই ক্ষেত্রের প্রায় প্রতিটি কঠিন মামলাই নিকাহর সময়েই এড়ানো যেত। শিগগিরই বিয়ে করছেন, বা কাউকে পরামর্শ দিচ্ছেন — এই পাঁচটি অভ্যাস বেশিরভাগ ঝামেলা ঠেকিয়ে দেয়।
- সই করার আগে মোহরের ঘরগুলো নিজে পড়ুন, আর প্রকৃত পরিশোধ না হলে কখনোই সম্পূর্ণ পরিশোধিত লিখতে দেবেন না।
- উশুল এমন রাখুন যা বর সত্যিই দিতে পারবেন, আর সেদিন ঠিক কত টাকা দেওয়া হলো তা লিখে রাখুন।
- বাকি অংশের জন্য লিখিত তারিখ বা সময়সূচি ঠিক করুন, খোলা রাখবেন না। দুটি অঙ্কই শান্তভাবে ঠিক করার উপায় আছে দেনমোহর কত ধরা উচিত লেখায়।
- স্বর্ণ বা জমি দিলে অলংকার না লিখে নির্দিষ্ট করে লিখুন — ওজন, ক্যারেট, দাগ-খতিয়ান।
- কনের সত্যায়িত কপিটি কনের কাছেই রাখুন, আর রেজিস্টারটি কোন কাজী অফিসে আছে তা জেনে রাখুন।
একটি কথা, সুর নিয়ে
মোহর চাওয়া লোভ নয়, কোনো পরিবারের ওপর আক্রমণও নয়। এটি এমন কিছুর দাবি, যা দিতে স্বামী রাজি হয়েছিলেন এবং যা পাওয়ার অধিকার কনের ছিল। আবার এই লেখাটি আদালতে যাওয়ার পক্ষে সাফাইও নয়। বেশিরভাগ পরিবারই ভালো করে যদি সৎভাবে, লিখিতভাবে ও আগেভাগে মিটিয়ে ফেলে।
এখানে amarjibon কোথায়
মোহর নিয়ে বেশিরভাগ বিরোধের শুরু এমন পরিবারে, যারা বিয়ের আগে টাকা নিয়ে সত্যিকারের আলোচনাই করেনি। amarjibon-এ সেই আলোচনা আগে শুরু হয়, আর শক্ত জমিতে দাঁড়িয়ে। প্রতিটি প্রোফাইল এনআইডি ও লাইভনেস সেলফি দিয়ে যাচাই করা, প্রথম আলাপ থেকেই পরিবার যুক্ত থাকতে পারে, আর যা সত্যিই মিল ঠিক করে সেগুলো ধরেই ফিল্টার করা যায় — ধর্মচর্চা, শিক্ষা, পেশা, নিজ জেলা, আর কাজ ও থাকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রত্যাশা। প্ল্যাটফর্মটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই, আর আপনি না চাইলে ফোন নম্বর গোপন থাকে।
আরও পড়ুন
- বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ে: আইনত যে অনুমতি লাগবেই
- বিয়ের জন্য ইস্তিখারা কীভাবে করবেন
- ইসলামে স্বামী ও স্ত্রীর অধিকার: সহজ একটি তালিকা
**amarjibon.com-এ বিনামূল্যে প্রোফাইল খুলুন, অথবা অ্যাপটি নামিয়ে নিন Google Play বা App Store থেকে।** বিয়ে, সিরিয়াসভাবে।