কাবিননামা: ঘর ধরে ধরে পড়ে নিন
কাবিননামায় ২৫টি ঘর আছে, অথচ বেশিরভাগ পরিবার একটিও না পড়ে সই করে দেয়। কোন ঘরে কী লেখা হয়, আর কোন পাঁচটি ঘর বছরের পর বছর পরের সবকিছু ঠিক করে দেয় — সব এখানে।
টেবিলের ওপর রেজিস্টারটা ঘুরিয়ে দেওয়া হলো। করিডোরে কারও চাচা ফোনে কথা বলছেন। কনের মা চেয়ার গুনছেন। কাজীর সহকারী পাতার নিচের দিকে একটা লাইনে আঙুল রেখে বললেন, এখানে সই করুন। সবাই সই করলেন। বিশ মিনিট পর রেজিস্টার বন্ধ, চা এসে গেছে, ঘরের আলোচনা অন্য দিকে চলে গেছে।
অথচ ওই পাতাটিই আগামী পঞ্চাশ বছর এই বিয়ের পক্ষে কথা বলবে — একমাত্র সে-ই। দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার, পাসপোর্ট, স্পাউস ভিসা কিংবা তালাক নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে আদালত জানতে চাইবে না দুই পরিবারের মনে কী ছিল। আদালত ফরমটি পড়বে। তাই এতে কী লেখা আছে তা জেনে নেওয়ার জন্য জীবনের দশ মিনিট খরচ করাই যায়। নিচে কাবিননামার ঘরগুলো এক এক করে দেওয়া হলো।
কাবিননামা আসলে কী
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন করেন লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার, যাঁকে আমরা কাজী বলি — মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী। প্রত্যেক রেজিস্ট্রারের একটি নির্দিষ্ট এলাকার লাইসেন্স থাকে এবং তিনি একটি বাঁধাই করা রেজিস্টার রাখেন। আপনার বিয়ে সেই রেজিস্টারের একটি এন্ট্রি, আর আপনি বাড়িতে যেটি নিয়ে আসেন সেটি ওই এন্ট্রির সত্যায়িত নকল।
ছাপা ফরমটিতে ২৫টি নম্বরযুক্ত ঘর আছে। বেশিরভাগই দাপ্তরিক তথ্য। কিন্তু ছয়টি ঘর পরে যা কিছু ভুল হতে পারে তার প্রায় সবটাই ঠিক করে দেয়, আর এই লেখাটি সেগুলোর ওপরই সময় নেয়। আর কিছু না পড়লেও ১৩, ১৪, ১৫, ১৭, ১৮ ও ২১ নম্বর ঘর পড়ুন।
১ থেকে ১২ নম্বর ঘর: কে, কবে, আর কারা সাক্ষী
- ১ নম্বর — বিয়ে যে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন বা শহর, থানা ও জেলায় হয়েছে। এটি ঠিক করে দেয় এন্ট্রিটি কোন রেজিস্ট্রারের এখতিয়ারে পড়বে।
- ২ ও ৪ নম্বর — বর ও তাঁর বাবার নাম-ঠিকানা, এবং কনে ও তাঁর বাবার নাম-ঠিকানা।
- ৩ ও ৬ নম্বর — দুই পক্ষের বয়স বা জন্মতারিখ। এটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। আইনি সর্বনিম্ন বয়স পুরুষের ২১ ও নারীর ১৮।
- ৫ নম্বর — কনে কুমারী, বিধবা নাকি তালাকপ্রাপ্ত। এটি স্পষ্ট করে লেখা হয়, কারণ ইদ্দত এবং কিছু ক্ষেত্রে মোহরের সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে।
- ৭ থেকে ১০ নম্বর — দুই পক্ষের নিযুক্ত উকিল (প্রতিনিধি) এবং সেই নিয়োগের সাক্ষীরা। বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিয়েতে দুই ঘরের মধ্যে সম্মতি এভাবেই যাওয়া-আসা করে।
- ১১ নম্বর — বিয়ের সাক্ষীদের নাম, বাবার নাম ও ঠিকানা। এঁদেরই আদালত ডাকতে পারে।
- ১২ নম্বর — বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার তারিখ, যা ২৪ নম্বর ঘরের নিবন্ধনের তারিখ নয়। দুটি গুলিয়ে ফেলবেন না।
এসব শুনতে নাটকীয় কিছু নয়, কিন্তু কাবিননামা পরে কাজে না লাগার সবচেয়ে সাধারণ কারণ এখানকার ভুলই। প্রতিটি নাম এনআইডির সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলতে হবে, আর পাসপোর্ট-সনদে ব্যবহৃত বানানের সঙ্গেও এক থাকতে হবে। এনআইডিতে এক বানান আর কাবিননামায় আরেক বানান থাকলে সেই সমস্যা দূতাবাসে, ব্যাংকে আর ভূমি অফিসে বারবার ফিরে আসবে।
১৩ নম্বর ঘর: দেনমোহরের পরিমাণ
পুরো পাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাটি এখানেই। ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্ত থেকেই এই ঘরে লেখা দেনমোহর স্বামীর কাছে স্ত্রীর ব্যক্তিগত পাওনা — তাঁর পরিবারের নয়, সংসারেরও নয়।
অঙ্কে ও কথায় দুইভাবেই লিখুন। কখনো ফাঁকা রেখে পরে অফিসে গিয়ে পূরণ করার সুযোগ দেবেন না, আর যাঁরা আগে কখনো এ নিয়ে কথাই বলেননি তাঁদের দিয়ে বিয়ের দিন গোল একটা সংখ্যা ঠিক করাবেন না। আপনার পরিবার যদি টাকার বদলে ভরি স্বর্ণে মোহর ধরে, তা স্পষ্ট করে বলুন এবং সমপরিমাণ অঙ্কটি সাবধানে লিখিয়ে নিন — পাঁচ বছর আগে যে সংখ্যা পরিমিত শোনাত, আজ তা অনেক বড় দায়। ন্যায্য অঙ্কে পৌঁছানোর উপায় আছে দেনমোহর কত টাকা ধরা উচিত লেখায়।
১৪, ১৫ ও ১৬ নম্বর ঘর: কতটা উশুল, আর বাস্তবে কতটা দেওয়া হলো
মোট অঙ্কের চেয়ে এই তিনটি ঘর বেশি জরুরি, অথচ পরিবারগুলো ঠিক এগুলোই এড়িয়ে যায়।
- ১৪ নম্বর — মোহরের কতটা উশুল (মুয়াজ্জাল, এখনই পরিশোধযোগ্য) আর কতটা বাকি (মুওয়াজ্জাল, পরে বা তালাক বা মৃত্যুর সময় পরিশোধযোগ্য)। ৫ লাখ টাকার পুরোটাই উশুল, আর ৫ লাখ টাকার মধ্যে উশুল মাত্র ২০ হাজার — এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিয়ে। নিয়মকানুন আছে উশুল ও বাকি দেনমোহর লেখায়।
- ১৫ নম্বর — বিয়ের সময় মোহরের কোনো অংশ বাস্তবে পরিশোধ হয়েছে কি না, হলে কত। বাংলাদেশের পারিবারিক আইনে সবচেয়ে ক্ষতিকর এন্ট্রিটি এখানেই হয়: এক টাকাও হাতবদল না হয়ে "সম্পূর্ণ পরিশোধিত" লিখে দেওয়া। একবার সই হয়ে গেলে কনেকে প্রমাণ করতে হয় যে ঘটনাটি ঘটেনি, আর আদালত শুরু করে কাগজ থেকেই।
- ১৬ নম্বর — মোহরের অংশ হিসেবে কোনো সম্পত্তি বা অলংকার দেওয়া হয়েছে কি না, তার বিবরণ ও দুই পক্ষের সম্মত মূল্যসহ। বরপক্ষের দেওয়া গয়না প্রায়ই কনেকে না জানিয়ে এখানে মোহরের হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। স্বর্ণ হিসাবে ধরা হলে ভরি ও সম্মত মূল্য লিখিত থাকা চাই।
১৭ নম্বর ঘর: যে ফাঁকা জায়গাটি প্রায় সব দম্পতি নষ্ট করেন
১৭ নম্বর ঘরটি বিশেষ শর্তের জন্য। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক কাবিননামায় এটি ফাঁকা থাকে, আর সেটি নিরপেক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত নয় — এটি একটি হারানো সুযোগ।
পরিবারগুলো এখানে যেসব শর্ত লেখে তার মধ্যে আছে দম্পতি কোথায় থাকবেন, স্ত্রী পড়াশোনা বা চাকরি চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, কিংবা বাকি মোহর পরিশোধের সময়সূচি। শর্তটি কাজে আসতে হলে তা আইনসম্মত ও বিবাহচুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে, তাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখার ইচ্ছা থাকলে বিয়ের দিন তাৎক্ষণিকভাবে না লিখে আগেই একজন পারিবারিক আইনজীবীকে দিয়ে ভাষাটা ঠিক করিয়ে নিন। তাড়াহুড়ায় লেখা লম্বা বাক্যের চেয়ে ছোট, শান্ত ও নির্দিষ্ট একটি বাক্যের দাম অনেক বেশি।
১৮ ও ১৯ নম্বর ঘর: তালাকের অধিকার
১৮ নম্বর ঘরে জানতে চাওয়া হয়, স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেছেন কি না এবং কোন শর্তে। একেই বলে তালাকে তৌফিজ, আর বাংলাদেশি নারীর জন্য পুরো ফরমের সবচেয়ে কাজের লাইনটি এটিই। এখানে হ্যাঁ লেখা থাকলে স্ত্রী স্বামীর সম্মতি বা আদালতের মামলা ছাড়াই, স্বামী যে নোটিশ পদ্ধতি অনুসরণ করেন সেই একই পদ্ধতিতে বিয়ে শেষ করতে পারেন। ফাঁকা থাকলে বা না লেখা থাকলে তাঁর হাতে থাকে খোলা বা আদালতের পথ, দুটোই ধীর। পার্থক্যটি ব্যাখ্যা করা আছে খোলা ও তালাক লেখায়।
১৮ নম্বর ঘরটি পূরণ হয় কারও চোখ না পড়া অবস্থায়, বড়জোর দশ সেকেন্ডে। এই দেশের বিপুল সংখ্যক নারীর পরের কয়েকটি বছর ওই দশ সেকেন্ডেই ঠিক হয়ে গেছে। সই করার আগে পড়ুন। আর বিয়ে যদি হয়েই গিয়ে থাকে, আজ রাতেই নকলটা বের করে পড়ে ফেলুন।
১৯ নম্বর ঘরটি এর উল্টো পিঠ: সমঝোতার মাধ্যমে স্বামীর নিজের তালাক প্রদানের ক্ষমতা কোনোভাবে সীমিত করা হয়েছে কি না।
২০ থেকে ২৫ নম্বর ঘর: আগের স্ত্রী, পড়ানেওয়ালা ও ফি
- ২১ ও ২২ নম্বর — বরের কোনো স্ত্রী বর্তমানে আছেন কি না, আর থাকলে তিনি মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী সালিশি পরিষদের অনুমতি নিয়েছেন কি না, সেই অনুমতির স্মারক নম্বর ও তারিখসহ। এই ঘরটি পড়ুন। উত্তরটি লিখিতভাবে দেখার এটিই কনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক সুযোগ।
- ২৩ ও ২৪ নম্বর — যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন তাঁর নাম ও ঠিকানা, এবং নিবন্ধনের তারিখ।
- ২৫ নম্বর — নিবন্ধন ফি। দেনমোহরের অঙ্কের সঙ্গে যুক্ত একটি সরকারি হার আছে, আর সেটি জানা থাকলে বেশি টাকা নেওয়া থেকে বাঁচা যায়। দেখুন বাংলাদেশে বিবাহ নিবন্ধন।
সই করার আগে পাঁচ মিনিটের রুটিন
- রেজিস্টারটি নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিতে বলুন এবং সময় নিন। এই অনুরোধে আজ পর্যন্ত কাউকে না বলা হয়নি।
- টেবিলে রাখা এনআইডির সঙ্গে প্রতিটি নাম ও তারিখ অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে নিন।
- ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর ঘর জোরে পড়ুন। উশুলের অঙ্কটি দুই পক্ষের সমঝোতা অনুযায়ী কি না দেখুন, আর যা পরিশোধ হয়নি তা যেন পরিশোধিত লেখা না হয়।
- ১৭ নম্বর ঘরটি দেখুন এবং সচেতনভাবে ঠিক করুন এটি ফাঁকা থাকবে কি না।
- ১৮ নম্বর ঘরে যা লেখা হয়েছে তা দম্পতির সমঝোতা অনুযায়ী কি না নিশ্চিত করুন।
- বেরোনোর আগে সত্যায়িত নকল নিয়ে নিন, না পেলে সংগ্রহের তারিখ ঠিক করে আসুন — আর কনের কপিটি কনের কাছেই রাখুন।
নাম বা ঠিকানায় ভুল থেকে গেলে তা সংশোধন হয় যে রেজিস্ট্রারের কাছে রেজিস্টারটি আছে তাঁর মাধ্যমে, প্রমাণপত্র দিয়ে; সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়া এখানে ধাপে ধাপে দেখানো আছে। নকল হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে গেলে রেজিস্টার থেকে নতুন সত্যায়িত নকল তোলা যায় — পদ্ধতিটি এখানে ব্যাখ্যা করা। যেটি আর বদলানো যায় না, তা হলো কেউ না পড়ে সই করে দেওয়া মোহরের অঙ্ক।
আলোচনাটি কাজী আসার আগেই হওয়া উচিত
কাবিননামার যে ঘরগুলোতে ভুল হয়, তার প্রায় সবই হয় কারণ সিদ্ধান্তটি প্রথম দশ সপ্তাহে না নিয়ে শেষ দশ মিনিটে নেওয়া হয়েছে। যেসব পরিবার তারিখ ঠিক হওয়ার অনেক আগেই টাকা, চাকরি, থাকার ব্যবস্থা আর প্রত্যাশা নিয়ে সৎভাবে কথা বলে নেয়, সই করার টেবিলে তাদের তর্ক করার কিছু থাকে না।
amarjibon-এ প্রতিটি প্রোফাইল এনআইডি ও লাইভনেস সেলফি দিয়ে যাচাই করা, প্রথম আলাপ থেকেই পরিবার যুক্ত থাকতে পারে, আর আপনি সেসব বিষয়েই ফিল্টার করতে পারেন যা সত্যিই মিল ঠিক করে — ধর্মচর্চা, শিক্ষা, নিজ জেলা, কাজ ও সংসার নিয়ে প্রত্যাশা। এটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই, আর আপনি না চাইলে ফোন নম্বর গোপন থাকে।
আরও পড়ুন
- দেনমোহর কখনো পরিশোধ না হলে কী হয়? আইনি পথগুলো
- ওয়ালিমা: সুন্নাহ, আদব আর খরচ কতটা হওয়া উচিত
- বাংলাদেশে বিয়ের ফটোগ্রাফি: কত দেবেন আর কী চাইবেন
**amarjibon.com-এ বিনামূল্যে প্রোফাইল খুলুন, অথবা অ্যাপটি নামিয়ে নিন Google Play বা App Store থেকে।** বিয়ে, সিরিয়াসভাবে।